ইসলামের ভবিষ্যত নিয়ে জ্ঞানগুরুর শেষ প্রশ্ন

সময়: ২৬ মার্চ ২০২০, ৪:২৩ অপরাহ্ণ

লেখক:

উৎস: কোরানের রহস্যময় জগত

টপিক: ,

ট্যাগ: ,

লেখক প্রোফাইল 

বড় করুন

ছোট করুন

জ্ঞানগুরু তার শিষ্যদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে বিশেষ সভায় ডেকেছেন। সবাই ক্লাসে প্রবেশ করে বোর্ডে আলোচনার শিরোনাম লেখা দেখতে পেল: শেষ প্রশ্ন

সবাই ক্লাসে যার যার জায়গায় বসে গেল। কিন্তু আজ যেন সবার মধ্যেই এক ধরনের অজানা অস্থিরতা কাজ করছে। তারা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছছে। কেউ জোরে শ্বাস ছেড়ে মনের অজানা আবদ্ধতা কাটাতে চাচ্ছে।

বুড্ডা সবার শেষে ক্লাসে ঢুকে আলোচনার শিরোনাম দেখে কিছুক্ষণ হা করে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বসে পড়ল।

গুরুজী ক্লাসে এসে বসার আগেই কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার পর বসলেন। আবারও কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর সবার সালামের উত্তর দিলেন।

– আমার প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুগণ! আজ আমি তোমাদেরকে ডেকেছি একটা প্রশ্ন করার জন্য। আজীবন তো তোমরাই আমাকে প্রশ্ন করে এসেছ। কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম ঘটবে। আজ বরং আমি ই তোমাদেরকে একটা প্রশ্ন করব। এবং আমি তার উত্তর চাইব না। কোনো উত্তর গ্রহণও করব না। বরং বলতে পার যে যাবার আগে আমি তোমাদের কাছে এই প্রশ্নটাই রেখে যাব। রেখে যাবার মতো আমার কাছে তো আর কিছু নেই।

বুড্ডা উঠে দাঁড়িয়ে বলল – গুরুজী, ‘যাবার আগে’ কথাটা বুঝি নি।

– আমরাও বুঝি নি, গুরুজী – বাকিরা এক সাথে বলে উঠল।

গুরুজী বললেন – তাহলে তোমাদেরকে একটা সুসংবাদ দিই। তা হলো, আগামী সভা হবে তোমাদের সাথে আমার শেষ সভা। সেদিন আমি আনুষ্ঠানিকভাবে তোমার কাছ থেকে বিদায় নেব। তার পর থেকে আমি আর তোমাদের হয়ে দর্শনচর্চা করব না।

– আপনি এ কি বলছেন, গুরুজী! – সবাই একযোগে বলে উঠল। ক্লাসে শুরু হয়ে গেল অনিয়ন্ত্রিত আহাজারি এবং পারস্পরিক কথাবার্তা। কান্নার রোল পড়ে গেল। গুরুজী চুপ করে বসে রইলেন।

খানিক পর কাঁদতে কাঁদতে বুড্ডা বলল – গুরুজী, এ আপনি কী বললেন? এ কিভাবে সম্ভব? আর এই সংবাদ কিভাবে আমাদের জন্য সুসংবাদ হতে পারে?

– আমি জানি এ বিষয়ে তোমরা কিছু কথা বলতে চাইবে। তাই এ নিয়ে আলোচনার জন্য একটা আলাদা সভার পরিকল্পনা করে রেখেছি। সে দিন অন্য কোনো আলোচনা সম্ভব হবে না বলে শেষ প্রশ্নটা রেখে যাওয়ার জন্য আজ তোমাদেরকে একত্র করেছি। মানুষ যাবার আগে কিছু না কিছু রেখে যায়। আমার মতো ক্ষুদ্র জ্ঞানকর্মীর পক্ষ থেকে একটা প্রশ্ন ছাড়া তোমাদের জন্য রেখে যাওয়ার মতো আর কিছু খুঁজে পাই নি।

ক্লাস আবারও নীরব হয়ে গেল। সবাই অশ্রুসজল নয়নে গুরুজীর দিকে তাকিয়ে রইল।

গুরুজী বললেন – আমার প্রশ্ন মুসলিমদের ভবিষ্যত নিয়ে। আর এই অর্থে মানবজাতির ভবিষ্যত নিয়ে।

সোহাগ বলল – হায় হায়! গুরুজী, এই জাতীয় প্রশ্নের জবাব তো আমরা আপনার কাছ থেকেই আশা করব। কিন্তু আপনি ই যদি এই জাতীয় প্রশ্ন আমাদেরকে করেন তাহলে…

– তাহলে আমরা তার জবাব কোথায় খুঁজব? – রিশাদ সোহাগের প্রশ্নটা সমাপ্ত করল।

ইমরান পালোয়ান বলল – গুরুজী, প্রশ্নটা না করলে কি নয়? আপনি যে প্রশ্ন উচ্চারণ করে ফেলবেন তার জবাব না খোঁজাই তো বাকিদের শাস্তির কারণ হবে। তার চেয়ে কি এটাই ভালো ছিল না যে আমরা না জেনে মার খাচ্ছি আর অসহায়ের মতো মরছি? যা ঘটার তা ঘটছে।

– ইমরান ঠিকই বলেছে, গুরুজী – বলল মামুন তাসির – আমি বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে কথা তুললে আমার স্ত্রী তো সরাসরি বলে দেয় : থাক, তোমাকে আর জগত উদ্ধার করতে হবে না। মনে আছে? আজ কিন্তু বাজার থেকে পোকায়-খাওয়া বেগুন কিনেছ। মেয়েটাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।

ফিরুজ বলল – গুরুজী, আমরা তো জেনেই গেছি যে শেষ যামানায় মিথ্যার জয় হবে। মুসলিমদের ইমানী পরীক্ষা চলবে। পরের কথা তো আগেই বলে দেয়া হয়েছে। তাহলে আমাদের আর কী ই বা করার আছে? যাই করি না কেন, অন্তত এটুকু তো সঠিক যে আমাদেরকে সবকিছু মেনে নিয়েই সামনে এগোতে হবে।

গুরুজী মামুনের দিকে তাকিয়ে বললেন – আমরা এমন এক সময়ে পদার্পণ করেছি যখন রাস্তার পাশে শুয়ে থাকা একজন ভিখারিকেও গোটা মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা করতে হবে। সুতরাং একজন বেগুন বিক্রেতা বা ক্রেতা বা রাঁধুনীকেও।

ফিরুজের দিকে তাকিয়ে – রসূল(স) আমাদেরকে শেষ যামানায় যা যা ঘটবে তা বলে গেছেন। কিন্তু তিনি কি তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন? তিনি কি বলেছেন যে যা ঘটবে তার জন্য মুসলিমদের কোনো দোষ নেই? রসূল(স) এর আগেকার রসূলগণও একই কথা বলে গেছেন। বিষ্ণুপুরাণের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে কলিযুগ সম্পর্কে সব কিছু বলা আছে।

দেখ, আমি ঠিক এই ব্যাপারেই আমার শেষ প্রশ্নটা রেখে যাব। এমন এক প্রশ্ন যা তোমরা গোটা মুসলিম জাহান মিলে কখনও কল্পনাও কর নি।

তানভীর বলল – গুরুজী, সেই প্রশ্ন দিয়ে কী হবে যার জবাব আমরা আপনার কাছ থেকে আশা করতে পারব না? আজ ইসলামের যে অবস্থাই হোক, মুসলিমদের অবস্থা ভালো নয়। কোথাও মসজিদেই মুসলিম নিধন চলছে, কোথাও বা মুসলিমদরকে ধর্ম পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে – যেমন কোরবানি করতে দেয়া হচ্ছে না, কোথাও বা ধর্মের আদর্শ অবলম্বনের জায়গায় ব্যক্তি-স্বাধীনতার পক্ষের আইন দিয়ে এমন আঘাত করা হচ্ছে যে অধর্মই সেই জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে, যার ফলে উন্নত দেশগুলোতে বাবা-মায়েরা সন্তানদেরকে ধর্মপথ অবলম্বনের ক্ষেত্রে নৈতিক চাপ দিতে পারছে না, কোথাও বা ‘মানবাধিকার’ নামক ধারনার যাতাকলে আইনকেও পিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে, ইত্যাদি। অর্থাৎ ইসলাম থাকলেও তা মানার ক্ষেত্রে মুসলিমদের কোনো অধিকার ও নিরাপত্তা নেই। সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের জন্য ধর্মীয় নিরাপত্তা বলে কিছু নেই।

মোল্লা মহিউদ্দিন বলল – গুরুজী, সবকিছুর মধ্যে যে-ই একটু ভালো হয়ে চলতে যাচ্ছে তাকেই সম্ভাব্য সব ধরনের দুখ-কষ্ট ভোগ করতে করতে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। বুঝতে পারছি যে আমাদেরকে শুধু জান্নাতে গিয়েই একটু শান্তি খুঁজতে হবে। ইহকালে নিদারুণ কষ্টেও থাকতে হবে আবার তার মধ্য দিয়েই পরকালের রোজগার করতে হবে। কিন্তু ইহকালে দুখ-কষ্ট যদি একটা সীমা পার হয়ে যায় তাহলে আর পরকালও ধরে রাখা যায় কি না সন্দেহ, কারণ তখন তো ইমানই রাখা যায় না। এহেন অবস্থায় আমরা যদি আপনাকে পথ-প্রদর্শক হিসেবে কাছে না পাই তাহলে আমরা হতাশ হয়ে যাব, দিগভ্রান্ত হয়ে যাব।

গুরুজী কিছুক্ষণ নীরব থেকে কথা বলতে শুরু করলেন – নীরবতা হলো সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ সামাজিকতার চিহ্ন। তাই তোমাদের সাথে থাকাকালীন কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলাম। সারাটা জীবন শুধু কথাই বলেছি। তোমরা আমার উপদেশ নিতে নিতে আমাকে অহংকারী বানিয়ে দিয়েছ। ফলে সারা জীবন ভেবে এসেছি যে আমি খুব জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান এবং আমার উচিত শুধু উপদেশ দেয়া।

– হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর – বলল সোহাগ। – গুরুজী, বুঝতে পারছি না আপনি কেন এভাবে কথা বলছেন। আপনাকে কেউ হেয় প্রতিপন্ন করলে আমরা কেউই তা সহজে নিতে পারি না। এমনকি আপনি নিজেও যদি নিজেকে ছোট করে দেখেন, তাও না। আমাদেরকে হতাশ করবেন না, গুরুজী।

গুরুজী বললেন – আমি যে বিষয়ে কথা বলি তার দিকে কান দেয়ার মতো লোকের সংখ্যা খুবই কম। আল্লাহ বলেছেন – উপদেশ দাও, যদি উপদেশে কাজ হয়। আমি কেন কথা বলব, যদি আমার কথায় কাজ না হয়? আমার কিছু ছাত্র বিভিন্নভাবে ধর্মপ্রচারের কাজ করে। তারা আমাকে জানিয়েছে যে তারা আমার হয়ে যে-সত্য প্রচার করতে চায় তার প্রতি মানুষের কোনো আগ্রহ নেই। অথচ ইসলাম ও মুসলিমদের অস্তিত্বের জন্য যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারা তাই তুলে ধরে। এই আত্মবিরোধ বড়ই ঋণাত্মকভাবে ইংগিতবহ। ধ্বংস যখন দরজায় কড়া নাড়ে তখন মানুষ মৌলিক সত্যকে ত্যাগ করে লোক-দেখানো উপাসনায় মত্ত হয়ে তাদের ধার্মিকতার তৃষ্ণা মেটায়। আমার ছাত্রেরা বলল যে মানুষ ধর্মের ব্যাপারে কিছু তাবিজ-কবচ, আয়াত-ভিত্তিক আমল, তসবি-তাহলিল এই জাতীয় বিষয়গুলো খোঁজে। সত্য নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। ধর্ম নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। মানুষ এতই ধার্মিক হয়ে গেছে যে আজানের আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে বসে থাকে এবং আজান হওয়ার সাথে সাথে মসজিদের দিকে দৌড় দেয়। মসজিদে গিয়ে আবার নামাজ শেষে তা’লিমে যোগ দেয়। ফলে অসুস্থ মা যে দুইটা পাকা কলা কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বলেছিলেন, তা ভুলে গিয়ে বাড়ি ফিরে মাকে বলে – মা, আমি আবার দোকানে যাচ্ছি। – মানুষ এমন ধাঁচের ইমানদার হয়ে গেছে যে অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে ফেলছে অথচ নিজের ধর্মের মধ্যে যে অসংখ্য ভাগ তৈরি হয়েছে তা নিয়ে কারও কোনো মাথা-ব্যথা নেই। ধর্মের জ্ঞানচর্চা চলছে কেবল মুখস্থবিদ্যা এবং যুক্তিতে অন্যকে হারিয়ে নিজে জিতে যাওয়ার চর্চার ভিত্তিতে। এই যুক্তি এতোটাই ক্ষুরধার হয়ে গেছে যে তা নিজের ধর্মের ঐক্যের চাদরটাকেও কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। অথচ তারা ভুলে গেছে যে বিভাজন কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ:

কিন্তু তারা (মানুষ) নিজেদের ব্যাপারকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে সন্তুষ্ট। তাই ওদেরকে কিছুকালের জন্য বিভ্রান্তিতে থাকতে দাও। /// [সূরা মু’মিনূন, ৫৩-৫৪]

আর (হে বিশ্বাসীগণ!) তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শন আসার পর বিভক্ত হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করেছে। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। /// [সূরা আল-ই-ইমরান, ১০৫]

‘মহাশাস্তি’ কথাটার প্রতি মনোযোগ দাও। এই শাস্তি তো আমরা ইহকালেই দেখতে পাচ্ছি। নয় কি? নিজ নিজ মতবাদের অংগনে বিচ্ছিন্নতাবাদী ধর্মগুরুদের ইমানি শক্তি এতোটাই প্রবল হয়ে গেছে যে আল্লাহর শাস্তিকেও তারা ভয় পাচ্ছেন না। তবে জগতের নিউটনীয় বিপরীত ক্রিয়া কর্তার ওপর কর্মের প্রতিফল ঠিকই আপতিত করছে।

যা হোক, সারা জীবনই তো এ নিয়ে কথা বলেছি। এর মধ্যে আমার মতো মানুষের কথা বলার কী ই বা প্রয়োজন। আমি তো শুধু ঐক্যের কথা বলি।

তোমরা ধর্মীয় নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। ধর্ম অবলম্বন করতে গেলে অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে যাও কি না, তা নিয়ে চিন্তিত। বিভিন্ন কৌশলগত আইনের দ্বারা ধর্মের বিধানকে অকার্যকর করে তোলা হয় কি না, সেই ভাবনায় অস্থির। ইত্যাদি। ইত্যাদি। শেষ জামানায় ধর্মের কী নাজেহাল অবস্থা হবে, তা নিয়ে হতাশাগ্রস্ত। অথচ – অথচ – অথচ –

– অথচ? – সবাই একযোগে বলে উঠল।

– অথচ আল্লাহ কোরানে এক বারও বলেন নি যে মুসলিম কখনও ব্যর্থ হবে বা হারবে। এক বারও না। বরং আল্লাহ কোরানে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে প্রকৃত বিশ্বাসী এমন কি ইহকালেও জীবন-যাপনে এবং ধর্মাচরণে সফলই হবে, শুধু পরকালে নয়। তার ধর্মের সামাজিক ভিত মজবুতই থাকবে, দুর্বল হবে না। তাহলে আমরা কিছু আয়াত দেখি:

তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও ভালো কাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্বর্তীদেরকে ; আর তিনি তো তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন, মজবুত করবেন ও তাদেরকে ভয়ের পরিবর্তে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার উপাসনা করবে, আমার কোনো শরীক করবে না। তারপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারাই হবে সত্যত্যাগী।  [সূরা নূর, ৫৬]

ভালোভাবে খেয়াল কর। আল্লাহ সৎকর্মকারী বিশ্বাসীদেরকে শুধু পরকালে নয়, ইহকালেও ভালো থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। ধর্মীয় নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। অথচ বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি তার একেবারে উল্টোটাই। কেন এমন হচ্ছে? জগতে যা ঘটছে এবং ঘটতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে, তার কিছুই তো কোরানে বলা হয় নি। তাহলে? কেন সেগুলো ঘটছে?

বলো, ” হে বিশ্বাসী দাসগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। যারা এ পৃথিবীতে ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে মংগল। আল্লাহর পৃথিবী বিশাল। ধৈর্যশীলদেরকে তো অশেষ পুরস্কার দেয়া হবে।  [ সূরা জুমার, ১০]

অর্থাৎ সামান্য কিছুকাল তো বিশ্বাসীকে পরীক্ষা করাই হবে, তবে ভালো কাজে ধৈর্য নিয়ে পড়ে থাকলে পুরস্কার পাওয়া যাবেই। এই আয়াতে আল্লাহ ঝামেলা এড়াবার জন্য প্রয়োজনে আল্লাহর ‘বিশাল’ পৃথিবীর অন্যত্র হিজরত করতে বলেছেন। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে সব জায়গার নিরাপত্তা-চিত্রই একই রকমের। কিন্তু কেন? কেন?

আমার প্রেরিত দাসদের সম্পর্কে আমার এ প্রতিশ্রুতি সত্য হয়েছে যে তাদেরকে সাহায্য করা হবে এবং আমার বাহিনীই বিজয়ী হবে।  [সূরা সাফফাত, ১৭১-১৭২]

এই আয়াতটা অবশ্য কেবল নবী রসূলগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমরা জানি যে আল্লাহ নবীগণকে শত বাধার মধ্যেও সাহায্য করেছেন।

যারা সত্যের আলো ফুঁ দিয়ে নেভাতে চায় তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলে রেখেছেন যে বিশ্বাসীদেরকে সামান্য কষ্ট দেয়া ছাড়া তারা আর কিছুই করতে পারবে না। এই অংগীকারটা আল্লাহ সার্বজনীনভাবে করে রেখেছেন। সূরা আল-ই-ইমরান এর ১১১ ও ১১২ নাম্বার আয়াতে এমনকি পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক তথ্য সহকারে এই আশ্বাসটি প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ বর্তমানের বাস্তবে ঠিক বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে।

সূরা বাকারার ৬২ নাম্বার আয়াতের মূল আশ্বাসটা সূরা মায়িদার ৬৯ নাম্বার আয়াতেও দেয়া হয়েছে:

নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাসী ইহুদি সাবেয়ী (অগ্নি উপাসক, তথা হিন্দু ধর্মালম্বীগণ) ও খ্রিস্টান তাদের মধ্যে যে-কেউ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে ও ভালো কাজ করবে তার কোনো ভয় নেই আর সে দুঃখিতও হবে না।

আমাদের অনেকে তো অন্যান্য ধর্মের লোকেদের ব্যাপারে খুব বেশি ভালো ধারণা পোষণ করতে প্রস্তুত নই, অথচ এই আয়াতে আল্লাহ তাদের কারও কারও চরিত্রের উন্নত বৈশিষ্ট্যের সংবাদই শুনিয়েছেন।

ধর্মের সঠিক পথে থাকলে যে শুধু পরকাল নয় ইহকালেও কল্যাণ মেলে, তা ইসলাম তো দূরের কথা অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও সত্য। যেমন:

আর যদি তারা তওরাত, ইঞ্জিল বা যা তাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তাদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে তাতে প্রতিষ্ঠিত থাকত তাহলে তারা সকল দিক থেকে প্রাচুর্য লাভ করত।  (সূরা মায়িদা, ৬৬)

আল্লাহ সব প্রেরিত ধর্মের অনুসারীদেরকেই উভয় জীবনে মংগল দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:

যারা শ্বাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে ইহজীবনে ও পরজীবনে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন। (সূরা ইব্রাহীম, ২৭)

ওদেরকে দুই বার পুরস্কৃত করা হবে [ইহকালে ও পরকালে]। (সূরা কাসাস, ৫৪)

নিশ্চয়ই আমি আমার রসূলদেরকে ও বিশ্বাসীদেরকে পার্থিব জীবনে ও কেয়ামতের দিন সাহায্য করব। (সূরা মু’মিন, ৫১)

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে আজ যাবতীয় বিচারে মুসলিমদের যে অবস্থা চলছে, তা যে ঘটতেই হবে এমন কথা কোরানে বলা হয় নি।

আমার প্রশ্ন হলো, এই যদি হয় আল্লাহর অংগীকার, তাহলে মুসলিমদের এই হাল কেন? কেন?

জগতের এত শত শত ধর্মের ধারাবাহিকতায় এবং পূর্ণাংগতা ও সমাপ্তিসূচক এই যে মহান ধর্ম পাঠানো হলো, এ কি বিশ্বাসীদের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনার জন্য? তোমাদের কি তাই মনে হয়?

আমার প্রশ্ন শেষ। জবাব আমার কাছে চেয়ো না। আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দিয়ো। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

সবার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।

একই বিভাগে আরও

আত্মজ্ঞানের ভূমিকা – ২

আত্মজ্ঞানের ভূমিকা – ১

আল-কোরআনের অজানা রহস্য – ২

আল-কুরআন এর অজানা রহস্য – ১

ভালোবাসার শানে নুজুল

আরও পড়ুন

নাস্তিকের মনস্তত্ত্ব – ১

আল-কুরআন, সূরা নিসা – আয়াত ১

রক্ত ঝরছে…

বই

এই শহরে